আল্লাহ এবং পরকালের আবাস্থলের পথে যাত্রা-০২

1284

বিষয়বস্তু

বইটি সংক্ষিপ্ত, শিক্ষামূলক কবিতা নিয়ে রচিত। গ্রন্থকার এর নাম রেখেছেন ‘আল্লাহ্ এবং পরকালের দিকে যাত্রা’ এবং কবিতার সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণের নাম দিয়েছেন ‘নিঁখোত মুক্তো’। বইয়ের ধরণ এবং সক্ষিপ্ততা এমন যে, এটি বিবেচিত হতে পারে পরিচিতি অথবা প্রথম প্রদর্শনী অথবা সুলুকের বিজ্ঞান হিসেবে।

বইটিতে আলোকপাত ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়েছে আল্লাহর পথে যাত্রার প্রধান প্রধান মনজিল সমূহ নিয়ে যা হৃদয়াঙ্গম করা খুবই প্রয়োজন। মনজিল বলতে বুঝায় প্রশংসনীয় গুণাবলী- আন্তরকিতা, ভালবাসা, ভয়, আশা, ধৈর্য, সন্তুষ্টি অথবা আত্ম-অস্বীকৃতি- যা অর্জনে হৃদয় সিদ্ধি লাভ করে, নিজের মাঝে দৃঢ়ভাবে গেঁথে নেয়। যখন এটি ঘটে, তখন হৃদয়কে বলা হয় বিশেষ গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। যদি প্রশংসনীয় গুণাবলী দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে এবং এতে স্থির না হয়, তাহলে হৃদয়কে বলা হয় একটি অন্তর্বর্তী অবস্থা যা এখনও মঞ্জিলে পৌছুতে পারেনি।

এ দু’টোর মাঝে পার্থক্য পরিষ্কার হতে পারে নিম্মোক্ত উদাহরণের মাধ্যমেঃ

আল্লাহর পথে যাত্রীদের অন্যতম একটি মনজিল হচ্ছে ‘আত্মত্যাগ’। যা কুরআন, সুন্নাহ এবং উম্মাহর ধার্মিক বান্দাদের মুখ নিঃসৃত বাণী দ্বারা প্রমাণিত হয়। সুতরাং ক্ষনস্থায়ী দুনিয়ার প্রতি অনীহা সৃষ্টি হওয়া , যারা দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট তাদের প্রতিও অনীহা এ মঞ্জিলের অন্যতম বৈশিষ্ঠ্য। অন্যদিকে ঐ সকল লোকের প্রশংসা এবং সাহচর্য কামনা করা যারা ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সর্বোপরি পরকালে উপর সকল প্রত্যাশা নিবেদিত করে। এ সবই আত্মত্যাগের অনুশীলনের ফসল। তারপর যদি সফলতা ধরা দেয়, তখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে এমন কিছু কর্ম দৃশ্যমান হয়, যা তাদের হৃদয়ে ভাবের উপস্থিতির ইঙ্গিত করে, যেমন অন্ধত্ব এবং বস্তুবাদ এড়িয়ে চলা এবং ন্যায়নিষ্ঠ ও আধ্যাত্মিক কাজে-কর্মে নিয়োজিত থাকা। এই ‘ভাব’ তারপর বিরুদ্ধ প্রভাবকে প্রতিহত করে। যেমন অহমিকার পরোক্ষ ইঙ্গিত শয়তানি পূজা এবং আত্মার বাতিক তাকে ধাবিত করে দুনিয়াবী অন্ধত্বের দিকে। এই প্রচন্ড আক্রমণের ঢেউয়ে এই ভাব দুদোল্যমান অবস্থায় থাকতে পারে, এমনকি এটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি এসকল প্রভাবকে প্রতিহত করা যায়, এর কার্যকারিতা হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল এবং গ্রথিত হয়, তখন এটিকে বলা হয় মনজিল।

শুলুকের উদ্দেশ্যাবলীর মাঝে একটি হচ্ছে ‘ভাবের’ অভিজ্ঞতা থেকে মঞ্জিলের অভিজ্ঞতায় পৌঁছার পরিবর্তনকে সাহায্য করা। তাছাড়া নির্ভরতা, ধৈর্য, ভয়, আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি ইত্যাদির অভিজ্ঞতা স্থায়ীভাবে বিন্যাস করা। এসকল অত্যাবশ্যকীয় এবং প্রশংসনীয় গুণাবলীর মাধ্যমে সামগ্রিক পরিবর্তনের জন্য প্রকৃত বাহন হিসেবে অভ্যন্তরীণ সংগ্রামকে বিবেচনা করা হয়। যার ফলে এসকল গুনাবলী অর্জিত হয় এবং মূদ্রিত হয় হৃদয়ে। রাসূলে কারীম (সাঃ) বলেন, ‘জ্ঞান অর্জিত হয় শিক্ষার মাধ্যমে এবং আত্মসংযম অর্জিত হয় এটি প্রয়োগের মাধ্যমে’।

অনুবাদ সম্পর্কে কথা

১। বইয়ের জটিল দুটি আরবী সংস্করণ এই অনুবাদের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম সংস্করণ হচ্ছে শায়েখ আলী হাসান আল হালাবি। আর দ্বিতীয়টি প্রস্তুত করা হয়েছে আশরাফ ইবনে আব্দ আল মাকসুদ কর্তৃক ১৫ টির একটি। আল সাদী শিরোমান দিয়েছেন, তিনি সংস্করণ করেছেন। তাদের সেবা এবং প্রচেষ্টার জন্য আল্লাহ্ তাদের উভয়কে উত্তম প্রতিদান দিন।

২। ইবনে আল কায়্যিম এর কথা থেকে অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে যিনি একজন গুনী ইসলামীক স্কলার এবং ইসলামের বাহ্যিক এবং পরোক্ষ জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওস্তাদ, আল্লাহ্ তার কবরকে আলোয় আলোকিত করুন এবং পবিত্র করুন তার আত্মাকে। অধিকাংশ কথাগুলোই তার ইসলামিক আধ্যাত্মিকতার উপর লিখিত বিখ্যাত অংশ থেকে নেওয়া হয়েছে যার শিরোনাম মাদারিজ আস সালিকিন (পথিকদের মঞ্জিল) যাতে পূর্বের মুসলিমদের থেকে সুলুকের ওস্তাদ এবং ধার্মিক ব্যক্তিবর্গের মতামত রয়েছে।

৩। আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই সাফিয়া দেবা, আসিফ শরীফ এবং আরসালান ওবায়দুল্লাহ্কে যারা অনুবাদের সঠিকতা যাচাই করেছেন এবং এর মানোন্নয়নের জন্য মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছে। আবু রুমাইশার প্রতি আমি খুবই কৃতজ্ঞ সে শুধু অনুবাদ পরীক্ষাই করেনি প্রকৃত গদ্যের অনুবাদে প্রচুর অবদান রেখেছে। আল্লাহ্ তাদের প্রত্যেক অনুগ্রহ করুন এবং উভয় জগতে মঙ্গল করুন।

৪। প্রত্যেক পরিচ্ছেদের শুরুতে শিরোনাম অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া এসকল শিরোনামের জন্য ব্যবহৃত উৎসসমূহের একটি গ্রন্থপঞ্জী এই বইয়ের শেষে অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে, সাথে নাম এবং পরিচিতি।

পরিশেষ

বিশ্বাসী আধ্যাত্মিক প্রবৃদ্ধির অনুসন্ধানে এবং আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার বাসনায় সর্বদা এটা স্মরণ রাখে যে, তাঁর বিষয়গুলো এই পার্থিব জগৎ কেন্দ্রিক নয় বরং তাকে পুনরুজ্জীবতি করা হবে। এ সম্পর্কে রাসূলে আকরাম (সাঃ) বলেন: ‘বান্দা যখন আমাকে স্মরণ করে আমি তাঁর সঙ্গে থাকি। যদি তাঁর মাঝে সে আমাকে স্মরণ করে আমিও আমার মাঝে তাকে স্মরণ করি। যদি সে আমাকে কোনো বৈঠকে স্মরণ করে, আমি এর চেয়ে ভালো কোনো বৈঠকে তাকে স্মরণ্ম করি। যদি সে আমার নিকটবর্তী হওয়ার জন্য এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তাঁর দিকে এক হাত এগিয়ে যাই এবং যদি সে আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসে, আমি তাঁর দিকে ৬ ফুট এগিয়ে যাই। যদি সে আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তাঁর দিকে দৌড়ে যাই’

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর প্রতি, যিনি বিশ্ব জাহানের প্রভূ। আমাদের ওস্তাদের উপর আল্লাহর রহমত ও বরকত নাজিল হোক। মুহাম্মদ (সাঃ), তাঁর পরিবারবর্গ এবং সাহাবায়ে কেরামের উপর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।

আবু আলিয়া সুরখীল ইবনে আনোয়ার শরীফ
(৩১ আগস্ট, ২০০১ সিই)
লন্ডন, ইংল্যান্ড

চলবে……